বাসাভাড়া ২৪ ঘণ্টার, গেট কেন রাত ১১টার পর বন্ধ
রাজিউল হাসান
রাজধানীর অনেক এলাকার বাসায়ই প্রধান ফটকে টানানো সাইনবোর্ডে দেখা যায়, রাত ১১টা বা ১২টার পর গেট বন্ধ। অর্থাৎ, রাত ১১টা বা ১২টার পর বাসায় ঢোকা যাবে না। ঢুকতে হলে মালিকের বিশেষ অনুমতি লাগবে, নতুবা কেয়ারটেকারকে (তত্ত্বাবধায়ক) কোনোভাবে ‘ম্যানেজ’ করতে হবে। ক্ষেত্রবিশেষে সেই ‘ম্যানেজ’ উৎকোচে গিয়ে ঠেকে।
বাড়িওয়ালারা যুক্তি দেখান, নিরাপত্তার খাতিরে তাঁরা রাত ১১টা বা ১২টার পর গেট বন্ধ করে দেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাসাভাড়া যদি দেওয়া হয় ২৪ ঘণ্টার জন্য, তাহলে রাত ১১টা থেকে সকাল ৬-৭টা পর্যন্ত গেট কেন বন্ধ থাকবে? ওই সময়ের জন্য ভাড়া তো আর কম নেওয়া হয় না। বরং, এভাবে গেট বন্ধ রেখে ঝুঁকি বাড়ানো হয়।
বাসাবাড়ির মালিক-ভাড়াটে দ্বন্দ্ব নতুন কিছু নয়। নানা কারণে এসব দ্বন্দ্ব লেগেই থাকে। কোথাও ভাড়াটে সময়মতো ভাড়া দেন না কিংবা বাসাটি ঠিকভাবে যত্ন নেন না বলে দ্বন্দ্ব হয়। আবার কোথাও বাসার মালিকের চাপিয়ে দেওয়া শর্তে দ্বন্দ্ব বাধে। তবে সব ছাপিয়ে রাজধানীর বাসাবাড়িতে বাড়িওয়ালাদের চাপানো গেট বন্ধের এই নিয়ম ভাড়াটেদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভাড়াটেরা বন্দী হয়ে পড়েন।
গত জানুয়ারিতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) একটি নির্দেশনা জারি করে। এতে বলা হয়, বাড়িতে ভাড়াটের যেকোনো সময়ে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে। বাড়ির সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিতে বাড়িওয়ালা কোনো পদক্ষেপ নিলে অবশ্যই ভাড়াটেকে অবগত করবেন এবং বাস্তবায়নের আগে তাঁদের মতামত নিতে হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে যুক্তিসংগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে ভবনে অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার স্বার্থে বাড়িওয়ালারা তাঁদের প্রত্যেক ভাড়াটেকে ছাদ ও মূল গেটের চাবি শর্তসাপেক্ষে দেবেন।
দিন দিন মানুষের ব্যস্ততা বাড়ছে। ফলে কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকার প্রয়োজনও বাড়ছে। রাজধানীর অধিকাংশ বাসিন্দাই ভাড়াটে। সে তুলনায় বাড়িওয়ালার সংখ্যা নগণ্য। কিন্তু সেই অল্পসংখ্যক মানুষ বৃহৎ সংখ্যক মানুষের ওপর অঘোষিত নিয়ম চাপিয়ে দিয়ে ভোগান্তি বাড়াচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাড়ির মালিকেরা নিরাপত্তার কথা বললেও এর পেছনে আরও একটি কারণ রয়েছে। তাঁরা মূলত একজন কেয়ারটেকারকে দিয়েই দারোয়ানের কাজ করান। একজন মানুষকে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে রাখা সম্ভব নয়। তাঁরও বিশ্রাম প্রয়োজন। ফলে রাতে গেট বন্ধ রেখে ভাড়াটেদের বন্দী রাখা হয়, আর কেয়ারটেকারকে দেওয়া হয় বিশ্রাম।
কিন্তু এতে ঝুঁকি বরং বাড়ে। রাতে গেট বন্ধ থাকলে কোনো দুর্যোগ বা বিপদের সময় ভাড়াটেরা দ্রুত বের হতে পারেন না। আগে কেয়ারটেকারকে ডেকে তুলতে হয়। ভূমিকম্প বা অগ্নিকাণ্ডের সময় এই বিলম্ব ভয়াবহ হতে পারে।
অনেক বাসায় ছাদেও প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। ফলে ভাড়াটেরা বিকল্প পথেও নিরাপদে সরে যেতে পারেন না। এই ঝুঁকি বাড়িওয়ালাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।
খরচ কমানোর জন্য একজন কেয়ারটেকারকে দিয়ে দীর্ঘ সময় কাজ করিয়ে বাড়িওয়ালারা শ্রম অধিকার ও মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন। স্বল্প পারিশ্রমিকে একজন মানুষকে দিয়ে একাধিক কাজ করানো কতটা ন্যায্য, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে রাতের বেলায় গেট বন্ধ রাখার কারণে কেয়ারটেকারদের জন্য অসৎ আয়ের সুযোগ তৈরি হয়। অনেক মানুষ মাঝরাতে বাসায় ফিরতে বাধ্য হন। তাঁদের ঢুকতে হলে কেয়ারটেকারকে ‘ম্যানেজ’ করতে হয়, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উৎকোচের মাধ্যমে হয়।
এ ধরনের প্রবণতা সমাজে অসততা ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ায়। কেবল খরচ বাঁচানোর জন্য বাড়িওয়ালারা এ পথ বেছে নিচ্ছেন। অথচ ভাড়া বাড়ানোর সময় তাঁদের কার্পণ্য দেখা যায় না। কিন্তু ভাড়াটেদের অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনীহা স্পষ্ট।
আমি মনে করি, ডিএনসিসির নির্দেশনায় উল্লিখিত শর্তগুলো প্রশংসনীয়। তবে শুধু নির্দেশনা জারি করলেই হবে না, বাস্তবায়নও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সমাজে নিয়ম ভাঙার প্রবণতা স্পষ্ট। তাই কার্যকর নজরদারি জরুরি।
একই সঙ্গে ভাড়াটেদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো বাড়িওয়ালা প্রবেশাধিকার সীমিত করলে বা চাবি দিতে গড়িমসি করলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে হবে।
লেখক: উপ-বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা।
