হাশরের ময়দানে মানবজাতির শেষ আশ্রয় মহানবী (সা.)

কামাল বারি বাংলাদেশ
প্রকাশ: ১৯ March ২০২৬, ০২:১০ PM | পঠিত: ৩২ বার

কাউসার লাবিব:
হাশরের ময়দান—ইসলামি বিশ্বাস অনুযায়ী এমন এক ভয়াবহ ও মহাসংকটময় দিন, যেদিন সমগ্র সৃষ্টি একত্রিত হবে মহান আল্লাহ তাআলার সামনে নিজেদের আমলের হিসাব দেওয়ার জন্য। এই দিনকে বলা হয় ‘ইয়াওমুল হিসাব’। কোরআন ও হাদিসের বর্ণনায় জানা যায়, সেদিন সূর্য মানুষের খুব কাছাকাছি চলে আসবে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে ভয়, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা। মানুষ তখন এতটাই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত থাকবে যে, কেউ কারও দিকে তাকানোর সাহস পাবে না; প্রত্যেকেই নিজের মুক্তির চিন্তায় ব্যস্ত থাকবে।
দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা, তীব্র ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও অসহনীয় কষ্টে অতিষ্ঠ হয়ে মানুষ অবশেষে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হবে—তাদের এমন একজনের প্রয়োজন, যিনি আল্লাহর কাছে সুপারিশ করে এই ভয়াবহ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে পারেন। তখন তারা একে একে আল্লাহর প্রেরিত শ্রেষ্ঠ নবী-রাসুলদের কাছে যাবে।
প্রথমে তারা আদি মানব ও প্রথম নবী হজরত আদম (আ.)-এর কাছে গিয়ে অনুরোধ জানাবে। তাঁকে স্মরণ করিয়ে দেবে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা—আল্লাহ তাঁকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, ফেরেশতাদের দিয়ে সিজদা করিয়েছেন এবং জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু হজরত আদম (আ.) নিজের একটি ভুলের কথা স্মরণ করে বিনয়ের সঙ্গে জানিয়ে দেবেন, তিনি এই সুপারিশের জন্য উপযুক্ত নন। এরপর তিনি মানুষকে পাঠিয়ে দেবেন হজরত নুহ (আ.)-এর কাছে।
হজরত নুহ (আ.)-এর কাছেও মানুষ একই আবেদন জানাবে। কিন্তু তিনিও নিজের একটি ঘটনার কথা স্মরণ করে অপারগতা প্রকাশ করবেন এবং তাদেরকে হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে যেতে বলবেন।
হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছেও একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। তিনিও নিজের জীবনের কিছু ঘটনার কথা স্মরণ করে সুপারিশ করতে অস্বীকৃতি জানাবেন এবং হজরত মুসা (আ.)-এর দিকে নির্দেশ করবেন।
এরপর মানুষ হজরত মুসা (আ.)-এর কাছে গেলে তিনিও নিজের একটি ভুলের কথা স্মরণ করে এই দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করবেন। তিনি তাদেরকে হজরত ঈসা (আ.)-এর কাছে পাঠাবেন।
হজরত ঈসা (আ.)-এর কাছেও মানুষ একই অনুরোধ জানাবে, কিন্তু তিনিও বলবেন—তিনি এ দায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নন। অবশেষে তিনি মানুষকে শেষ নবী, রহমাতুল্লিল আলামিন হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে যেতে নির্দেশ দেবেন।
সব নবী-রাসুলের কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে মানুষ তখন মহানবী (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হবে এবং আকুলভাবে বলবে, “হে আল্লাহর রাসুল, আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনিই আমাদের শেষ আশ্রয়।”
হাদিসে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা.) তখন আল্লাহর দরবারে হাজির হওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করবেন। অনুমতি পেয়ে তিনি মহান আল্লাহর সামনে সিজদায় লুটিয়ে পড়বেন এবং আল্লাহ তাঁকে যতক্ষণ ইচ্ছা সিজদায় রাখবেন। এরপর আল্লাহ তাআলা বলবেন, “হে মুহাম্মদ, মাথা ওঠাও। যা বলবে, তা শোনা হবে; সুপারিশ করো, তা কবুল করা হবে; প্রার্থনা করো, তা দেওয়া হবে।”
তখন মহানবী (সা.) আল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তন করবেন—যা আল্লাহ নিজেই তাঁকে শিখিয়ে দেবেন। এরপর তিনি উম্মতের জন্য সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তাআলা একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেবেন, এবং সেই অনুযায়ী মহানবী (সা.) বহু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
এই প্রক্রিয়া একাধিকবার সংঘটিত হবে। প্রতিবারই মহানবী (সা.) আল্লাহর দরবারে ফিরে গিয়ে আবার সুপারিশ করবেন এবং নির্ধারিত সংখ্যক মানুষকে মুক্তির সুযোগ করে দেবেন। অবশেষে কোরআনের ঘোষণানুযায়ী যাদের জন্য চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নাম নির্ধারিত হয়েছে, তারা ছাড়া আর কেউ জাহান্নামে অবশিষ্ট থাকবে না।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে:
“আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে ‘মাকামে মাহমুদ’-এ অধিষ্ঠিত করবেন।” (সুরা বনি ইসরাইল: ৭৯)
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী ‘মাকামে মাহমুদ’ হলো সেই সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদার স্থান, যেখানে মহানবী (সা.) হাশরের ময়দানে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুপারিশ করার বিশেষ অধিকার লাভ করবেন।
এই ঘটনা সহিহ বুখারির (হাদিস: ৭৪৪০) বর্ণনায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এটি মুসলমানদের জন্য একদিকে যেমন আশা ও সান্ত্বনার বার্তা বহন করে, অন্যদিকে তেমনি আখিরাতের প্রতি সচেতন হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—দুনিয়ার জীবনে নেক আমল, আল্লাহর প্রতি আনুগত্য এবং মহানবী (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণই হতে পারে পরকালের মুক্তির মূল 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।