শিশুকে সফল হিসেবে দেখতে চান? শুরু হোক ঘরের কাজ দিয়ে

কামাল বারি বাংলাদেশ
প্রকাশ: ২৯ March ২০২৬, ০২:১২ PM | পঠিত: ১৫ বার

ফিচার ডেস্ক, ঢাকা
্নিজের সন্তানকে সফল হিসেবে দেখতে কে না চায়? বিষয়টি কঠিন কিছু নয়, জানাচ্ছেন গবেষকেরা।
গবেষণা থেকে জানা গেছে, ঘরের কাজ করতে জানা শিশুদের জীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শৈশব মানে শুধু খেলাধুলা বা পড়াশোনা নয়; বরং এটি ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি গড়ার উপযুক্ত সময়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা, বিশেষ করে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭৫ বছরের একটি গবেষণা থেকে পাওয়া গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে ঘরের কাজে অংশ নেয়, প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তারা অনেক বেশি সফল হয়।
ঘরের ছোট ছোট কাজ শিশুদের মধ্যে এমন কিছু গুণ তৈরি করে, যা কোনো পাঠ্যবই শেখাতে পারে না। বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শৈশবের ছোট ছোট দায়িত্ব একটি শিশুকে মানসিকভাবে পরিপক্ব ও স্বাবলম্বী করে তোলে।
গবেষণা যা বলছে
হার্ভার্ড স্টাডি: ১৯৩৮ সাল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ গবেষণায় দেখা গেছে, সফল ব্যক্তিদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য ছিল—ছোটবেলা থেকে নিয়মিত ঘরের কাজ করতেন। এটি তাদের মধ্যে শক্তিশালী ওয়ার্ক এথিকস বা কাজের প্রতি নিষ্ঠা তৈরি করেছে।
প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য: ২০১৯ সালের একটি গবেষণা জানাচ্ছে, যেসব শিশু কিন্ডারগার্টেন থেকে ঘরের কাজে যুক্ত থাকে, পরবর্তী জীবনে তাদের গণিতের নম্বর এবং আত্মবিশ্বাস অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি হয়।
সঠিক সময়: মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণামতে, ৩ থেকে ৪ বছর বয়সে শিশুকে ছোট কাজে যুক্ত করা ভালো। ১৫ থেকে ১৬ বছর বয়সে শুরু করলে তার প্রভাব ততটা কার্যকর হয় না।
আত্মবিশ্বাস ও দায়িত্ববোধ
গবেষণা বলছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে নিজের খেলনা গোছানো বা ঘর পরিষ্কারের মতো কাজে অংশ নেয়, তাদের মধ্যে একধরনের আত্মকার্যকারিতা তৈরি হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘ ৭৫ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শৈশবে ঘরের কাজ করা শিশুরা প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় পেশাগত জীবনে অনেক বেশি সফল হয়। এর কারণ হলো, তারা অল্প বয়স থেকেই একটি কাজ শুরু করে তা শেষ করার আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করতে শেখে। এই অভ্যাস তাদের বড় হয়ে যেকোনো কঠিন কাজকে ভয় না পেয়ে বরং চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করতে সাহায্য করে।
সময় ব্যবস্থাপনা ও কর্মনিষ্ঠা
সাফল্যের একটি বড় শর্ত হলো সঠিক সময়ে সঠিক কাজ করা। ঘরের কাজে নিয়োজিত থাকলে শিশুরা বুঝতে শেখে, পৃথিবী শুধু তাদের ইচ্ছেমতো চলে না। তারা শিখে, পৃথিবীতে কিছু কাজ রুটিনমাফিক করতে হয়। পড়াশোনার ফাঁকে বা খেলার আগে নিজের কাপড় ভাঁজ করা বা থালাবাসন ধোয়ার মাধ্যমে তারা কাজের গুরুত্ব বোঝে। এই অভ্যাস বড় হয়ে তাদের সময়ানুবর্তী এবং নিষ্ঠাবান করে গড়ে তোলে।
সহমর্মিতা ও সামাজিক দক্ষতা
একটি শিশু যখন ঘরের কাজে হাত লাগায়, তখন সে পরোক্ষভাবে বাবা-মায়ের পরিশ্রমের মূল্য বোঝে। এতে তাদের মধ্যে গভীর সহমর্মিতা তৈরি হয়। তারা বুঝতে শেখে, সুন্দর পরিবেশ বজায় রাখতে পরিবারের সবার অবদান প্রয়োজন। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘরের কাজ করা শিশুরা অন্যদের চেয়ে বেশি বন্ধুবৎসল এবং পরোপকারী হয়।
স্বনির্ভরতা বনাম পরনির্ভরশীলতা
অনেক সময় অভিভাবকরা ভালোবেসে শিশুদের সব কাজ নিজে করে দেন। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এটি শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। এতে তারা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে এবং নতুন কিছু করার সাহস হারায়। অন্যদিকে, ৩ থেকে ৪ বছর বয়স থেকে শিশুকে ছোট ছোট কাজে উৎসাহিত করলে তারা স্বনির্ভর হয়ে ওঠে। তারা বোঝে, নিজের যত্ন এবং চারপাশ পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব নিজেরই।
বয়স অনুযায়ী কিছু সহজ কাজের তালিকা
৩–৫ বছর: খেলনা গুছানো, ময়লা জামাকাপড় ঝুড়িতে রাখা, পোষা প্রাণীকে খাবার দেওয়া।
৬–৯ বছর: খাবার টেবিল গোছানো, নিজের বিছানা ঠিক করা, বাগান করা বা গাছে পানি দেওয়া।
১০ বছর ও ততোধিক: কাপড় ভাঁজ করা, ঘর মোছা বা ঝাড়ু দেওয়া, হালকা রান্না বা খাবার পরিবেশন।
নিখুঁত হওয়ার প্রয়োজন নেই
শিশু যখন প্রথমবার ঘর বা থালাবাসন পরিষ্কার করবে, তা হয়তো নিখুঁত হবে না। কিন্তু অভিভাবকের কাজ হলো প্রচেষ্টার প্রশংসা করা। শিশুদের কাজ করানো মানে তাদের শৈশব কেড়ে নেওয়া নয়, বরং তাদের জীবনের বড় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা।
আজকের ছোট ছোট কাজই তাদের দায়িত্বশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। শিশুদের ঘরের কাজ করানো শুধুমাত্র পরিচ্ছন্নতার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে
 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।