ডিপ স্টেট বিতর্কে ইউনূস সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক:
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দেড় বছরের শাসন শেষে বিদায় নিয়েছে এক মাসের বেশি সময় আগে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে সমালোচনা এখনও থামেনি। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের দুর্নীতি, ১৩৩টি অধ্যাদেশ এবং বিদেশি চুক্তি নিয়ে বিতর্ক তীব্র। একমাত্র বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দীন ছাড়া সবার বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ হচ্ছে।
অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে বিশেষ সংসদীয় কমিটি বিশ্লেষণ চালাচ্ছে, যেগুলো জনস্বার্থের জন্য ছিল নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তা নির্ধারণ করা হবে। সংবিধান বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কিছু অধ্যাদেশ জারি হয়েছে অযাচিতভাবে।
বিদেশি চুক্তি নিয়ে বিতর্ক বিশেষ: বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিদায়ের আগে করা চুক্তি দেশের স্বার্থবিরোধী বলে ইউনূসের ঘনিষ্ঠরা অভিযোগ করেছেন। টিআইবি ও সিপিডির মতো থিঙ্কট্যাংকগুলোও এই চুক্তি সমালোচনা করছে।
সাবেক উপদেষ্টাদের অভিযোগ
২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে “ডিপ স্টেট” নামক শক্তিশালী প্রভাবশালী গোষ্ঠী থেকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার। ডিপ স্টেট চেয়েছিল নির্দিষ্ট শর্তে সরকার পরিচালিত হোক, বিএনপি নেতাদের সাজা দীর্ঘায়িত করা হোক। তবে অন্তর্বর্তী সরকার এই প্রস্তাব গ্রহণ করেনি, গণতন্ত্রকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন বলে আসিফ মাহমুদ দাবি করেন।
এর আগে এনসিপির আহ্বায়ক ও সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও ডিপ স্টেট প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছিলেন। উভয়ই ডিপ স্টেট কারা তা স্পষ্ট করেননি।
ডিপ স্টেটের প্রেক্ষাপট
‘ডিপ স্টেট’ হলো রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে থাকা প্রভাবশালী শক্তি, যারা নীতিনির্ধারণ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করে। ধারণাটি প্রথম আধুনিক তুরস্কে ব্যবহৃত হয়, পরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রভাবশালী ব্যুরোক্রেসি, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক-শিল্প জোট ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিলে ডিপ স্টেট ভাঙার উদ্যোগ নেন।
বাংলাদেশে ইউনূস সরকারের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব বেড়ে যায়। তাই অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর ডিপ স্টেটের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না।
কার্যক্রম ও বিতর্ক
প্রথম এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনবিমুখ ছিল। সরকার প্রথমে সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিত। তবে দেশের পরিস্থিতি ক্রমে তাদের জন্য চাপ তৈরি করেছিল। অভিযোগ রয়েছে, সরকারী ভিতরের কিছু উপদেষ্টা নির্বাচনের বিলম্ব ঘটাতে ও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে সক্রিয় ছিলেন।
ডিপ স্টেটের প্রভাব প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে, যেমন:
আরাকান আর্মির জন্য মানবিক করিডর তৈরি করার প্রচেষ্টা।
সেন্ট মার্টিনে পর্যটন ও যাতায়াত সীমিত করা।
চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশি কোম্পানির কাছে দ্রুত ইজারা দেওয়া।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের নামে সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ উপেক্ষা।
বেসরকারি খাতের নীরব ক্ষতি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোপন চুক্তি।
এসবই ডিপ স্টেটের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আনুগত্যের প্রমাণ বলে মনে করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানের প্রয়োজনীয়তা
দুর্নীতিবাজ উপদেষ্টাদের অবৈধ অর্থ পাচার এবং ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে হস্তক্ষেপের তথ্য অনুসন্ধান করলে ডিপ স্টেটের প্রভাব ও এজেন্ডা আরও স্পষ্ট হবে। প্রধান উপদেষ্টার দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতার আগ্রহের পেছনের কারণ বিশ্লেষণ করে ডিপ স্টেটের প্রকৃত চরিত্র উদঘাটন সম্ভব।
সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন
