ইতিহাস রক্ষার দায় থেকে জন্ম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের

কামাল বারি বাংলাদেশ
প্রকাশ: ২৬ March ২০২৬, ০৪:৩১ PM | পঠিত: ২০ বার

আসাদ আবেদীন জয়:

স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে টালমাটালভাবেই যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশের। সে সময়ের অভিজ্ঞতা খুব সুখকর ছিল না। তবুও একটি স্বাধীন দেশ—মানুষের মধ্যে ছিল অসংখ্য স্বপ্ন ও প্রত্যাশা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে ইতিহাসের চাকাকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয় একটি গোষ্ঠীর। দীর্ঘসময় ধরে দেশ অতিক্রম করে ইতিহাসের বিকৃতি ও বিস্মৃতির মধ্য দিয়ে।
এই প্রেক্ষাপটেই, মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের একদল তরুণের স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনা সংরক্ষণের তাগিদ থেকে জন্ম নেয় “মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর”।
রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের সীমাবদ্ধতা ও সময়ক্ষেপণের আশঙ্কা থেকে সরে এসে তারা সমাজের শক্তিকেই ভরসা করেছিলেন। তাদের বিশ্বাস ছিল, মুক্তিযুদ্ধ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয়—এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়। এই স্মৃতি সংরক্ষণে প্রয়োজন মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সেই ভাবনা থেকেই নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি শুরু হয় উদ্যোগ, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের যাত্রা শুরু করেন আক্কু চৌধুরী, আলী যাকের, আসাদুজ্জামান নূর, জিয়াউদ্দিন তারিক আলী, মফিদুল হক, রবিউল হুসাইন, সারওয়ার আলী ও সারা যাকের। তারাই এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। তাদের এই উদ্যোগে সারাদেশের মানুষের আর্থিক সহায়তা, স্মারক প্রদান এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ ইতিবাচক শক্তি জুগিয়েছিল।
২০২৬ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ত্রিশ বছর পূর্ণ করতে যাচ্ছে। এই উপলক্ষে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেন জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক। তিনি তুলে ধরেন জাদুঘরের শুরুর গল্প, নেপথ্যের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান অবস্থান।
যেভাবে তৈরি হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি, মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পূর্তি সামনে রেখে একদল তরুণ ভাবতে শুরু করেন—এই ইতিহাস কীভাবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ করা যায়। ব্যক্তিগত উদ্যোগের বাইরে গিয়ে একটি সমন্বিত জাতীয় প্রয়াসের চিন্তা থেকেই গড়ে ওঠে ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট’। এর মাধ্যমেই শুরু হয় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পথচলা।
মফিদুল হক বলেন, “আমরা মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্ম। বিশেষ করে আমরা যারা তখন তরুণ ছিলাম, তারা নানা উপায়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছি। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ যাত্রা শুরু করে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ইতিহাসের চাকাকে পেছনে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা শুরু হয়। দীর্ঘ সময় আমরা ইতিহাসের বিকৃতি ও বিস্মৃতির মধ্যে ছিলাম।”
ইতিহাস রক্ষার দায় থেকে জন্ম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের
তিনি বলেন, “এই সময়ে ব্যক্তিগত ও সামাজিক উদ্যোগে ইতিহাস সংরক্ষণের চেষ্টা হয়েছে—বই লেখা, চলচ্চিত্র নির্মাণ, ভাস্কর্য তৈরি, বধ্যভূমি সংরক্ষণ। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি বড় উদ্যোগের প্রয়োজন ছিল।”
১৯৯৫ সালে মুক্তিযুদ্ধের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে তারা উদ্যোগ নেন। গঠন করা হয় ‘মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি ট্রাস্ট’ এবং জাদুঘর প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়।
তিনি আরও বলেন, “শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে সময় লাগতে পারত এবং প্রকৃত ইতিহাস কতটা প্রতিফলিত হবে তা নিয়েও সংশয় ছিল। তাই সমাজের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে জাদুঘর গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিই।”
শুরুর দিকে নিজেদের উদ্যোগে একটি বাড়ি সংস্কার করে জাদুঘরের প্রাথমিক রূপ দেওয়া হয়, যাতে মানুষের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়।
শুরুর দিনের অভিজ্ঞতা
মফিদুল হক শুরুর সময়ের চ্যালেঞ্জকে ‘মধুর অভিজ্ঞতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “১৯৯৬ সালের ২২ মার্চ উদ্বোধনের দিন হরতাল ছিল। তারপরও অনেক মানুষ এসেছিলেন। দেশ-বিদেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।”
উদ্বোধনের সময় ‘শিখা চিরন্তন’ প্রজ্জ্বলন করা হয়, যেখানে শহীদ পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্য থেকে শুরু করে শহীদ জায়া ও মুক্তিযোদ্ধারা অংশ নেন। জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত পরিবেশনসহ অনুষ্ঠান চলাকালে বৃষ্টি শুরু হলেও তা অব্যাহত থাকে। এটিকে তারা প্রতীকী আশীর্বাদ হিসেবে দেখেন।
বর্তমান স্থাপনার ইতিহাস
বর্তমান জাদুঘর স্থাপনার জন্য সরকার নির্ধারিত মূল্যে জমি গ্রহণ করা হয়, যাতে স্বাধীনতা বজায় থাকে। স্থাপত্য নকশার জন্য প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রায় ৭০টি নকশা জমা পড়ে।
প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্পে জাদুঘর নির্মিত হয়, যার একটি বড় অংশ এসেছে জনগণের অনুদান থেকে।
৩০ বছরের সবচেয়ে বড় অর্জন
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের মতে, ত্রিশ বছরে সবচেয়ে বড় অর্জন হলো এটি জনগণের জাদুঘরে পরিণত হওয়া। ট্রাস্টিরা শুধু রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকলেও, এটি গড়ে তুলেছেন দেশের মানুষ।
বর্তমানে জাদুঘরে রয়েছে বিশাল আর্কাইভ, যার একটি ছোট অংশ প্রদর্শিত হচ্ছে। দেশ-বিদেশ থেকে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিদর্শন প্রদান করেছেন।
কী আছে জাদুঘরে
জাদুঘরের দুটি তলায় চারটি গ্যালারি রয়েছে। এখানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত দেশের ইতিহাস, ভূপ্রকৃতি ও সংস্কৃতি তুলে ধরা হয়েছে।
এছাড়া রয়েছে বাংলার নৌযান, ঢাকার মসলিন শাড়ি, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের হারিকেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আলোকচিত্র, পাল ও সেন যুগের নিদর্শন, সুলতানি ও মোগল আমলের স্থাপনার মডেল, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ইতিহাস ও চিত্রকর্ম।
ইতিহাস রক্ষার দায় থেকে জন্ম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের
এছাড়াও ১৯৭১ সালের শরণার্থী জীবনের চিত্র, পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী রাজাকার, আল বদর ও আল শামসের কার্যক্রম, নারী নির্যাতনের আলোকচিত্রও প্রদর্শিত হয়েছে।
মফিদুল হক একটি হৃদয়বিদারক ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন। তিনি জানান, এক মুক্তিযোদ্ধা বাবাকে খুঁজতে এসে না পেয়ে তাঁর দুই মাস বয়সী মেয়ে রেহানাকে উঠানে ফেলে বুট দিয়ে পিষে হত্যা করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। পরে বাবা এসে মেয়ের মৃতদেহ ধুয়ে-মুছে রূপসা নদীতে ভাসিয়ে দেন। মেয়ের কোনো ছবি না থাকায় তার পরনের জামা ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখেন বাবা। জাদুঘরে সেই ফ্রেমটিও রয়েছে।
তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট নিদর্শনকে আলাদা করা কঠিন। আমাদের কাছে এমন অনেক মানবিক গল্প রয়েছে, যা মানুষকে গভীরভাবে স্পর্শ করে।”
নতুন প্রজন্মের জন্য করণীয়
মফিদুল হক বলেন, ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া একটি জাতীয় দায়িত্ব। পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের নিজ এলাকার বধ্যভূমি, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার সম্পর্কে জানার জন্য উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
ইতিহাস রক্ষার দায় থেকে জন্ম মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের
সমসাময়িক প্রেক্ষাপট
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের তুলনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “প্রত্যেক সময়ের নিজস্ব প্রেক্ষাপট আছে। মুক্তিযুদ্ধের স্থান আলাদা। তবে নতুন প্রজন্ম যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে প্রেরণা নেয়, তাহলে তা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।”
দর্শনার্থীর সংখ্যা
জাদুঘর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ২০২৬ সালের ৭ মার্চ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন ১১ লাখ ৮০ হাজার ৫৩৭ জন দর্শনার্থী।
 

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।