শাফী ইমাম রুমী: দেশের জন্য ত্যাগের প্রতীক ও নতুন প্রজন্মের পথপ্রদর্শক
গাজী তুষার আহমেদ :
শাফী ইমাম রুমী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের এক অকুতোভয় বীর। তিনি নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, নিরাপদ ভবিষ্যত এবং বিদেশি শিক্ষা বিসর্জন দিয়ে মাতৃভূমির মুক্তির জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছিলেন। রুমী চাইলে সহজেই আমেরিকার ইলিনয় ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (IIT) পড়াশোনা করতে পারতেন। বড় ডিগ্রি, উন্নত জীবন ও আকর্ষণীয় ক্যারিয়ার—সবই তার জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু দেশপ্রেম, নৈতিকতা এবং বিবেক তাকে অন্য পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছিল।
রুমীর বাবা-মা, প্রকৌশলী শরীফ ইমাম ও জাহানারা ইমাম, তাদের সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাতে চেয়েছিলেন না। তবুও রুমী বলেছিলেন,
“আম্মা, দেশের এই অবস্থায় যদি তুমি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠাও, আমি হয়তো যাবই, কিন্তু আমার বিবেক চিরকাল অপরাধবোধে ভরিয়ে দেবে। বড় ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরলেও আমি কখনো নিজের বিবেকের সামনে মাথা উঁচু করতে পারব না। তুমি কি তাই চাও?”
মায়ের সম্মতি নিয়ে রুমী যোগ দেন ক্র্যাক প্লাটুনে, একটি গেরিলা সংগঠন যা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করত। ঢাকায় এসে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন আক্রমণ, ধানমণ্ডি রোডের গুরুত্বপূর্ণ অভিযানসহ একাধিক গেরিলা কার্যক্রমে অংশ নেন। সাহসিকতা ও নেতৃত্বের কারণে তিনি সহকর্মীদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন।
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট, নিজের বাড়িতে অবস্থানকালে রুমী পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। তার বাবা ও ভাইকে দুই দিন পর মুক্তি দেওয়া হলেও রুমী আর মুক্ত হননি। ৩০ আগস্টের পর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। রুমীর সহযোদ্ধা মাসুদ সাদেক জানান, চরম অতি্যাচার সত্ত্বেও রুমী কারো নাম প্রকাশ করেননি।
রুমী ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেননি, কিন্তু দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে ওঠেন। জাহানারা ইমামের স্মৃতিকথায় উল্লেখ আছে,
“রুমী ১৯৭১ সালে ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেনি, তবে কিছু একটা হয়েছিল। সে দেশের জন্য শহীদ হয়েছিল।”
আজও আমরা লক্ষ্য করি যে, মুক্তিযুদ্ধের স্মারকগুলো অনেক সময় ভেঙে ফেলা হচ্ছে, মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান করা হচ্ছে। যারা এই কাজ করছে, তারা আসলে দেশের শত্রু—দেশদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক। রুমীর মতো বীরেরা আমাদের দেখিয়েছেন দেশপ্রেম, সাহসিকতা এবং নৈতিকতার মূল মানে। নতুন প্রজন্মের উচিত এই বীরদের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পথ বেছে নেওয়া, যাতে তারা দেশের জন্য আত্মত্যাগ করতে দ্বিধা না করে।
শাফী ইমাম রুমীর জীবন আমাদের শেখায়—স্বার্থপরতা, ভয় বা সুবিধাবাদকে ত্যাগ করে দেশের কল্যাণে কাজ করতে হবে। দেশের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করা কোনো তুচ্ছ কাজ নয়; এটি চিরস্মরণীয় বীরত্ব। তার সাহস ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মকে দেখায়, কিভাবে তারা সঠিক ও ন্যায়পরায়ণ পথে চলতে পারে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, স্মারক এবং বীর শহীদদের সম্মান আমাদের সবার কাছে অমুল্য।
শাফী ইমাম রুমীকে শ্রদ্ধা জানানো মানে আমরা আমাদের দেশের মুক্তি ও মর্যাদা রক্ষা করি। তার জীবন এবং আত্মত্যাগ নতুন প্রজন্মের জন্য চিরন্তন শিক্ষার উৎস হয়ে থাকবে।
সূত্র:
জাহানারা ইমাম, রুমী স্মৃতি ও মুক্তিযুদ্ধের কাহিনি, ঢাকা, ১৯৭২।
মাসুদ সাদেকের সাক্ষাৎকার, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্র, ঢাকা।
বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ মিউজিয়াম ও আর্কাইভ রিপোর্ট, ১৯৭১–১৯৭২।
