দেশে হামের ভয়াবহ বিস্তার: টিকার বাইরে ১০% শিশু, বাড়ছে মৃত্যু ও শয্যাসংকট

কামাল বারি বাংলাদেশ
প্রকাশ: ৩০ March ২০২৬, ১০:০৩ AM | পঠিত: ১৪ বার

নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশে অতি সংক্রামক রোগ হামের প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১২টি জেলায় এ রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। এতে ইতোমধ্যে প্রায় চার ডজন শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। আক্রান্ত হয়ে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালগুলোতে কয়েক হাজার শিশু ভর্তি রয়েছে, যার ফলে অনেক জায়গায় শয্যাসংকট দেখা দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকা ছাড়াও নরসিংদী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা ও ভোলায় সংক্রমণের হার বেশি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হলেও রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে চিকিৎসকদের।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটে অস্থায়ীভাবে হাম আইসোলেশন কর্নার স্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে রাজধানীর সংক্রামক রোগ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

টিকাদান ঘাটতিই মূল কারণ
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে প্রায় ৮৬ থেকে ৯০ শতাংশ শিশু টিকা পেলেও অন্তত ১০ শতাংশ শিশু এর বাইরে থেকে যায়। এই ‘মিসিং’ শিশুদের একটি বড় অংশ কয়েক বছর পর সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে এবং হঠাৎ করে আউটব্রেক দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং রোগ নজরদারির অভাব বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্বাস্থ্যখাতে বিভ্রান্তিকর তথ্য
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী দাবি করেন, গত আট বছরে দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা এ বক্তব্যকে সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন। তাদের মতে, হামের টিকা নিয়মিত ইপিআই কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই দেওয়া হয়ে আসছে।
 নতুন ক্যাম্পেইনের প্রস্তুতি
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০২০ সালে জাতীয়ভাবে হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়। ২০২৪ সালে নতুন ক্যাম্পেইনের পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। তবে আগামী এপ্রিল মাসে নতুন করে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি চালুর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতি চার বছর অন্তর ফলোআপ টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো জরুরি, যাতে টিকার বাইরে থাকা শিশুদের আওতায় আনা যায়।
হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ
দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ইতোমধ্যে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে ২২ জন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১২ জন (সন্দেহভাজন), শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ১০৬ শিশু ভর্তি রয়েছে। পাবনায় ২৭ শিশু চিকিৎসাধীন এবং সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত তিন দিনে ৩০ শিশু ভর্তি হয়েছে।
 বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের মতো রোগ সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা দেওয়া যায়। তবে অক্সিজেন, জ্বর নিয়ন্ত্রণ ও নিউমোনিয়ার চিকিৎসা সুবিধার অভাবে অনেক ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠছে।
তাদের মতে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় পর্যাপ্ত সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় রোগীদের ঢাকামুখী হতে হচ্ছে, যা রাজধানীর হাসপাতালগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে দ্রুত সারাদেশে কার্যকর টিকাদান ক্যাম্পেইন চালু, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় বাড়ানো এবং রোগ নজরদারি জোরদার করা জরুরি। অন্যথায় সংক্রমণ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।