মহান একুশে শ্রদ্ধাঞ্জলি...

কামাল বারি বাংলাদেশ
প্রকাশ: ২১ February ২০২৬, ০২:৩৯ PM | পঠিত: ২১৭ বার

আব্দুল গাফফার চৌধুরী
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
 

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু

গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

ছেলে হারা শত মায়ের অশ্রু

গড়ায়ে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার সোনার দেশের রক্তে

রাঙানো ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো

একুশে ফেব্রুয়ারি

আমি কি ভুলিতে পারি

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ

আ...আ...আ..আ



নির্মলেন্দু গুণ
বসন্ত বন্দনা

হয়তো ফুটেনি ফুল রবীন্দ্রসঙ্গীতে যত আছে,
হয়তো গাহেনি পাখি অন্তর উদাস করা সুরে
বনের কুসুমগুলি ঘিরে। আকাশে মেলিয়া আঁখি
তবুও ফুটেছে জবা,—দূরন্ত শিমুল গাছে গাছে,
তার তলে ভালোবেসে বসে আছে বসন্ত পথিক।

এলিয়ে পড়েছে হাওয়া, ত্বকে কী চঞ্চল শিহরন,
মন যেন দুপুরের ঘূর্ণি-পাওয়া পাতা, ভালোবেসে
অনন্ত সঙ্গীত স্রোতে পাক খেয়ে, মৃত্তিকার বুকে
নিমজ্জিত হতে চায়। হায় কি আনন্দ জাগানিয়া।

এমন আগ্রাসী ঋতু থেকে যতই ফেরাই চোখ,
যতই এড়াতে চাই তাকে, দেখি সে অনতিক্রম্য।
বসন্ত কবির মতো রচে তার রম্য কাব্যখানি
নবীন পল্লবে, ফুলে ফুলে। বুঝি আমাকেও শেষে
গিলেছে এ খল-নারী আপাদমস্তক ভালোবেসে।

আমি তাই লঘুচালে বন্দিলাম স্বরূপ তাহার,
সহজ অক্ষরবৃত্তে বাঙলার বসন্ত বাহার।



কামাল বারি
প্রেমের প্রথম বর্ণ

মা গো তোর পাশে আছি— আমি তো ছিলাম বাহান্নয়;
তোকে নিয়ে এই আমি— মা গো তোকে নিয়ে বিশ্বময়!

মা গো তোর কোলে শিখি আমি প্রেমের প্রথম বর্ণ...;
পৃথিবীর দিকে দিকে মা গো জেগে আছি এই আমি—
মা গো তোর সুকোমল হৃদয়-কুসুমে— রক্ত বীজে;
অই প্রিয়মুখ মা গো— ভায়ের রক্তের লাল ঘ্রাণ;
আহা, অই মুখে ফুটে আছে আরাধ্য স্বদেশভূমি!
যে অধিকারে তাহারে আমরা জাগাই ঘন চুমি;

অপার শ্রদ্ধার এই মাটি— বাঙলার মাতৃঘ্রাণ...।
বিশ্ব মাকে দেখি মা গো তোমার বর্ণমালার প্রাণ;
চেতনার বীজ বুনে রেখেছি— জাগিয়ে রেখেছি `মা\';
তোমায় ছেড়ে মা আমি কখনও কোথাও যাবো না।



রাসেল আশেকী
ভাষাভূমি

​পবিত্র কিতাব হাতে এখানে জন্মাননি কেউ
   মাটি মেনে নেয়নি কোনো আগন্তুক।
      এখানকার মানুষ টিঠুপঙ্খির মতো অন্তরপোষা—
           কথা শিখিয়েছে প্রকৃতি, আশ্রয় দিয়েছে নিসর্গ।

সেই প্রকৃতি ও নিসর্গের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত আমার ভাষা পূর্বপুরুষের রক্তবিন্দু থেকে উত্তর প্রজন্মের জন্মফুল অবধি
নিত্যনতুনের পথে, অপরূপ সৌন্দর্যের  অলৌকিক হৃদয় প্রান্তরে— আপন আয়নায় আবিষ্কার করে অন্তর্মিলনের পবিত্র ভাষাভূমি।

   ​জানি, ভাষার মধ্যে স্বাধীনতা, ভাষার মধ্যে মুক্তি—
ভাষার মধ্যেই থাকে ভূমির সবুজ অন্তর্দৃষ্টি।

   অতএব, অন্তরভাষার মধ্য দিয়ে কথা বলা কিংবা নিজের মধ্য দিয়ে সেই ভাষাকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়া একই কথা।

   ​বহুমাত্রার সেই একই কথার অজস্র রূপ ছড়াতেই
ভাষাভূমির তীর্থ থেকে কথা বলছি পৃথিবীর সাথে
যে পৃথিবীর সমান বয়সী চিরতরুণ আমার সাহসী বর্ণমালা— দীর্ঘ শ্বাস ও স্বরের অন্তরঙ্গ সুরের মাদকে অসীম ব্রহ্মলোকে খাঁটি হতে হতে
এক একটি অক্ষরে বিস্তৃত আমার কাব্যপ্রাণ বর্ণমালা।

   ​ভাব আদান-প্রদানে মাটির উত্তাপ থেকে উঠে আসা
ন’হন্যের মতো অগ্নিজলে অক্ষয় সেই বর্ণমালার জন্ম
আমার জন্মের মতো
​​রক্ত ভেঙে রক্তের পথ ধরে সূর্যের সাক্ষাতে দাঁড়ানো
রক্ষাও রক্তের বিনিময়ে কান্নার অমল স্রোতে
বিশ্বভাষার বুকে জ্বেলে মাতৃভাষার রক্তশিখা।

   ​এখনও যার শরীর ভর্তি অসংখ্য রত্নের স্বাক্ষর, অগণিত বীর শহীদের স্মৃতিচিহ্ন— 
এখনও তার অন্তরে অফুরন্ত ভাবুক ঋত্বিক  কবি ঋষি অবতার আর বিবেকের আলো—
তারও অধিক সফল মানুষের মেধা শ্রম নিষ্ঠা ও সাধনায় উজ্জীবিত
একটি বিরাট স্বপ্নের প্রণতি এগিয়ে আসছে তার জাগরণের রূহানি বর্ণে
যে বর্ণমালায় \'হও\' বললেই অবিনশ্বরে হয়ে যায় মহামানবের উত্থান, \'না\' বললেই নষ্ট হয়ে যায় জীবনের সকল কীর্তি।

    এমন বর্ণমালার অমৃত অক্ষরে জন্মান মা—
                                   জন্ম দিতে সন্তানের ভবিষ্যত।
মহাপ্রকৃতির ফুসফুসে সংযুক্ত হয়ে কথা বলছি সেই মা’র সাথে— যে মা’র জন্য আমার এতদূর হাঁটা, এত নিকটে আসা, এত গভীরে ঢুকে আপন আয়নায় সারা পৃথিবী দেখা।

   ​আমাদের শাসক নেতা ওলি আউলিয়া কামেল কুতুব গাউস ফকির দরবেশ আর সন্তপথিকগণ—
যখন অস্থির অগ্নিতে গরম হয়ে উঠলেন—
মা বললেন, অঙ্গারে অঙ্গারে পূর্ণ হচ্ছে  মহাজনের অন্যায়, এখনই উঠবে ঝড়, নত শিরে ক্ষমা চাইতে হবে তার—   ঠকখাওয়া মানুষের কাছে!
শাসনে শোষনে নির্যাতনে নিপীড়নে বঞ্চনায় অবহেলায় যারা আজ গনগনে আগুনের গোলা থেকে এক-একটি শব্দবোমা!

    সাথে সাথে বাউলজন্ম নিলাম, বটবৃক্ষের ন্যায় ত্রিকালদর্শী এক ঋষি ভর করল দেহে—
খুলে গেল অনুভব অনুভূতি উপলব্ধির গিঁট;
জেনে গেলাম, জীবনের অর্থ ছোট নয়—
              নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাই শিল্পীর কাজ;
বুঝে নিলাম, ঝুলে থাকার চেয়ে লেগে থাকা শ্রেয়, 
আর আত্মহত্যার বদলে মা\'র আদেশ মান্য করা শ্রেষ্ঠ কর্ম— সামনে বর্ণাঢ্য সাজ।

    ​আর তখনই আমি, অসীম সীমায় জয় করে ভয়—
জন্মপ্রেমে, জীবনের ঢেউ তুলে ঢেউ ভেঙে,
ঘুরঘুরে পাখি ও নদীর মতো
বুকের পাঁজর থেকে অন্তরাত্মায় গেঁথে জলের ভাষা—
প্রাচীন গুহা, নতুন পথ, এগোতে এগোতে
  তিরতির ছুঁই ছুঁই অমৃতার অন্ধকারে
     ধরার আগুন জ্বালিয়ে পরম তৃষ্ণার হালে
          শুভ মানুষের শুভযাত্রার অবগাহনে—
দিব্যচোখে দেখলাম, ভাষার হৃৎপিণ্ড থেকে জন্ম নেওয়া
একটি মহাপ্রভাবের কুদরতি!

   আরও দেখলাম, একটি জ্যোতির্ময় রক্তপিণ্ডের ভাব থেকে জন্ম নেওয়া ভাষার পঞ্চভূতব্যাপী পরিভ্রমণের সময় অপরূপ দৃশ্যাবলির সে কী আশ্চর্য লীলা, যা প্রাকৃতিক সব আশ্চর্য অতিক্রম করে নিজেই এক মহাশ্চর্য!

বিনম্র চিত্তে পৃথিবীর চোখ আমার দিকে তুলে ধরলো 
সেই ভাষার মুকুট! 
           ​বললাম, পূর্ণ হোক পিতার ইচ্ছা মায়ের আশীর্বাদ।

    ​আমার যখন রোদজন্ম হলো
মা বললেন, ভেতর থেকে কথা ক, তোর মা হবে ভাষা।
আমি বললাম, তা-ই হোক।

   আমার যখন বৃষ্টিজন্ম হলো
মা বললেন, মাটি কামড়ে পড়ে থাক, তোর মা হবে মাটি।
আমি বললাম, তা-ই হোক।

     ​​যখন আমার বৃক্ষজন্ম হলো
মা বললেন, দুর্ভোগে বীর হয়ে দাঁড়া, তোর মা হবে দেশ।
আমি বললাম, তা-ই হোক।

     যখন আমার কবিজন্ম হলো
মা বললেন, সব দেহে প্রাণ দে, তোর মা হবে পৃথিবী।
আমি বললাম, তা-ই হোক।

 এভাবে যতবার জন্ম নেবো ততবার বলবো—
এখনও বলি, মা আমার দশমুখী দরজার অঢেল আলোর ঘর— সেই ঘরে বাস করি, আমি আর আমার পৃথিবী।
    পৃথিবী হাঁটে আমার পায়ে
            আমি ঘুরি পৃথিবীর সাথে
                     কণ্ঠে তুলে অন্তরের ভাষাভূমি।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।