বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনায় ঝরছে প্রাণ, ভেঙে পড়ছে পরিবার-
গাজী তুষার আহমেদ :
দেশে সড়ক দুর্ঘটনা যেন দিন দিন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনা অনেক পরিবারকে মুহূর্তেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবনই কেড়ে নেয় না—ভেঙে দেয় পুরো পরিবার, নষ্ট হয়ে যায় বহু স্বপ্ন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে মোট ৫১৭টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৪৩২ জন নিহত এবং ১ হাজার ৬৮ জন আহত হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর মধ্যে ১৮৭টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ৯টি জাতীয় দৈনিক, ৭টি অনলাইন সংবাদমাধ্যম, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
যানবাহনভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী ১৭৪ জন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বাসের যাত্রী ২২ জন, ট্রাক, পিকআপ, ট্রাক্টর ও লরির আরোহী ২৪ জন, প্রাইভেট কার ও মাইক্রোবাসের আরোহী ১৬ জন এবং থ্রি-হুইলারের ৬৪ জন যাত্রী নিহত হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তৈরি বিভিন্ন যানবাহনের ২৩ জন যাত্রী এবং ৭ জন বাইসাইকেল আরোহীও প্রাণ হারিয়েছেন।
দুর্ঘটনার স্থান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জাতীয় মহাসড়কে ১৫৭টি, আঞ্চলিক সড়কে ২১৩টি, গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি এবং শহরের সড়কে ৮৪টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য স্থানে ঘটেছে আরও ৭টি দুর্ঘটনা।
দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১১৩টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ২২৮টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ১০৪টি পথচারীকে চাপা দিয়ে, ৬৮টি অন্য যানবাহনের পেছনে আঘাত করে এবং ৪টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।
এসব দুর্ঘটনায় মোট ৮২৬টি যানবাহন জড়িত ছিল। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১৯৯টি, থ্রি-হুইলার ১৫২টি, বাস ৯৪টি, ট্রাক ১৩৮টি, পিকআপ ২৪টি, ট্রাক্টর ২৯টি, মাইক্রোবাস ১৪টি এবং প্রাইভেট কার ১২টি।
সময়ভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভোরে ৫ দশমিক ৬০ শতাংশ, সকালে ২২ দশমিক ৪৩ শতাংশ, দুপুরে ২০ দশমিক ১১ শতাংশ, বিকেলে ১৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ, সন্ধ্যায় ১৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ এবং রাতে ১৯ দশমিক ৭২ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যানে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ১২২টি দুর্ঘটনায় ১০৯ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ২৮টি দুর্ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছেন। রাজধানী ঢাকায় ৩২টি দুর্ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়কব্যবস্থা, অতিরিক্ত গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা।
প্রতিদিনই কোনো না কোনো পরিবারে নেমে আসে শোকের ছায়া। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তিকে মাসের পর মাস হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। এতে পরিবারগুলো আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়ে, হারিয়ে যায় জীবনের স্বাভাবিক গতি।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন মনে করে, সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে দক্ষ চালক তৈরির উদ্যোগ বাড়ানো, চালকদের নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, বিআরটিএর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ এবং মহাসড়কে সার্ভিস রোড ও ডিভাইডার নির্মাণ জরুরি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে ১৫ দশমিক ৭০ জন নিহত হলেও ফেব্রুয়ারিতে তা কিছুটা কমে গড়ে ১৫ দশমিক ৪২ জনে নেমেছে। তবে এই সামান্য হ্রাসকে স্থায়ী উন্নতির লক্ষণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছে সংগঠনটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতা, আইন প্রয়োগ এবং দায়িত্বশীল চালনার মাধ্যমেই কমানো সম্ভব সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহতা। কারণ জীবন একটাই—এক মুহূর্তের বেপরোয়া সিদ্ধান্তে একটি পরিবার চিরদিনের জন্য অন্ধকারে ডুবে যেতে পারে।
