৭ মার্চের ভাষণ থেকে স্বাধীনতার পথে জাতির অগ্রযাত্রা-

কামাল বারি বাংলাদেশ
প্রকাশ: ০৭ March ২০২৬, ১০:৪৩ AM | পঠিত: ১৪৮ বার

গাজী তুষার আহমেদ :
১৯৭১ সালের মার্চ মাস বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অগ্নিঝরা অধ্যায়। এই মাসেই স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেলিত হয়ে ওঠে সমগ্র জাতি। বিশেষ করে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বাঙালির মুক্তির সংগ্রামকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়। সেদিন ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সমাবেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ভাষণ দেন, তা শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না—বরং ছিল স্বাধীনতার অঘোষিত ঘোষণা। তাঁর বজ্রকণ্ঠে উচ্চারিত “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”—এই আহ্বানে সারা বাংলার মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্নে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে।
ভাষণে বঙ্গবন্ধু অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করেন এবং জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। তাঁর নির্দেশে কার্যত পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি শাসনের প্রশাসনিক কাঠামো অচল হয়ে পড়ে। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ব্যাংক পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ মেনে চলতে শুরু করে। এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলা ধীরে ধীরে একটি কার্যত স্বাধীন ভূখণ্ডে পরিণত হতে থাকে।
রাজনৈতিক অঙ্গনে ঐক্য
এই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিরল ঐক্যের চিত্র দেখা যায়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ৯ মার্চ পল্টন ময়দানের জনসভা থেকে বঙ্গবন্ধুর চার দফা দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, জনগণের অধিকারের প্রশ্নে কোনো আপস করা যাবে না। তাঁর বক্তব্যে স্বাধীনতার দাবির প্রতি দৃঢ় সমর্থন প্রতিফলিত হয় এবং আন্দোলনের শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়।
১২ মার্চ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ অসহযোগ আন্দোলনকে আরও গতিশীল করতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ‘সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের নির্দেশ দেন। এর ফলে গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত আন্দোলন সংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
শুধু রাজনীতিবিদই নয়, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘হিলাল-ই-ইমতিয়াজ’ খেতাব বর্জন করে প্রতিবাদ জানান। সাধারণ মানুষ, রিকশাচালক ও শ্রমিকেরা তাঁদের এক দিনের আয় শহীদদের সাহায্য তহবিলে দান করেন, যা আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
আন্তর্জাতিক মহলের সতর্কতা
রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেই সামরিক প্রস্তুতি ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতেও পরিবর্তন দেখা দিতে থাকে। পত্রিকাগুলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর থেকে খাদ্যবাহী জাহাজ জোরপূর্বক পশ্চিম পাকিস্তানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। এতে পূর্ব পাকিস্তানে কৃত্রিম খাদ্যাভাব সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এ সময় পূর্ব পাকিস্তানে বসবাসরত অবাঙালি ও পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তা এবং ধনী ব্যক্তিরা পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের বিশেষ ফ্লাইটে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যেতে শুরু করেন। সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক মহলও সতর্ক হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ তাদের বিশেষজ্ঞ ও কর্মীদের পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিদেশি দূতাবাসগুলোও তাদের নাগরিকদের ঢাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয়।
একই সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই ঘটনাও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে এবং পাকিস্তানের সামরিক শাসনের অগণতান্ত্রিক চরিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।
সংকটের ঘনীভবন
১৩ মার্চ সামরিক জান্তা প্রতিরক্ষা খাতের বেতনভুক্ত বেসামরিক কর্মচারীদের কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ১১৫ নম্বর সামরিক আদেশ জারি করে এবং অমান্যকারীদের সামরিক আদালতে বিচারের হুমকি দেয়। বঙ্গবন্ধু এই আদেশকে উসকানিমূলক আখ্যা দিয়ে প্রত্যাখ্যান করেন এবং জানান যে কোনো ভীতি প্রদর্শন করে আন্দোলন দমন করা যাবে না।
এদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা এয়ার মার্শাল আসগর খান ও ওয়ালী খান সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আহ্বান জানান। কিন্তু পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ১৪ মার্চ করাচিতে ‘দুই অংশে দুই সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর’-এর দাবি তোলেন। এই দাবি রাজনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তোলে এবং পরিস্থিতি সংঘাতের দিকে এগিয়ে যায়।
স্বাধীনতার অনিবার্য পথ
সব মিলিয়ে ১৯৭১ সালের মার্চের ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দেয় যে পূর্ব বাংলার মানুষ স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে প্রশাসন কার্যত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছিল এবং পাকিস্তানি শাসনের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ছিল।
৭ মার্চের ভাষণ থেকেই বাঙালির মুক্তির পথ নির্ধারিত হয়। সেই ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্নে ঐক্যবদ্ধ হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেই সংগ্রামই রূপ নেয় মুক্তিযুদ্ধে। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তাই বলা যায়—৭ মার্চের বজ্রকণ্ঠই ছিল মহান স্বাধীনতার অভিযাত্রার চূড়ান্ত আহ্বান।
তথ্যসূত্র:একাত্তরের মার্চে প্রকাশিত দৈনিক বাংলা এবং দৈনিক পাকিস্তান।একাত্তরের দিনপঞ্জি: সাজ্জাদ শরিফ সম্পাদনা (প্রথমা প্রকাশন)

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ খবরের আপডেট পেতে নোটিফিকেশন অ্যালাউ করুন।